
সজল ঘোষ : শিউলি ফুটেছে, সাদা কাশবনে সেজেছে প্রকৃতি। চলছে শুভ্র শরতের স্নিগ্ধতা। প্রকৃতির এমন মুগ্ধ নিপুণতা জানান দেয় শারদীয়া দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মন মাতানো কাশফুল আর শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধে জগৎজননী মহামায়া আসছেন। উৎসব-আনন্দে মুখর হবে সকলেই। আগামী ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মহাপঞ্চমী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। শিশিরভেজা দূর্বাঘাসের ওপর ঝরেপড়া শিউলী ফুল কুড়ানোর সময়টাতে মাতৃবন্দনায় মিলিত হবেন ভক্তকুল।
ইতিমধ্যে শিল্পীদের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় পূর্ণরূপে ফোটে ওঠেছে দৃষ্টিনন্দন অধিকাংশ প্রতিমা। সারা দেশের মতো সিলেটেও চলছে প্রতিমা গড়ার কাজ। এ কাজে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। দেবী দুর্গা আসছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিত করতে। ঢাক, ঢোল, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি দিয়ে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ভক্তরা।
ত্রিনয়নী দশভূজা দেবীর আসার ক্ষণে সনাতন হিন্দু ধর্মের মানুষরা মেতে উঠছেন আনন্দ-উল্লাসে। পূজোর প্রস্তুতির আমেজ বেড়ে গেছে শতগুণ। আগামী ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মহাপঞ্চমীর মধ্য দিয়ে শারদ উৎসব শুরু হবে। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার বর্ণিল সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ পুরোদমে চলছে। প্রতিমায় রঙ-তুলির বর্ণিল আঁচড় দিয়ে চলছেন শিল্পীরা। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে শিল্পীরা অবিরাম কাজ করছেন। পূজোর যাবতীয় উপকরণ, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, চণ্ডীপাঠ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আরতী, ভজন কীর্ত্তন, আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশনসহ নানা প্রস্তুতি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূজার আয়োজনকারী প্রতিটি কমিটি ও পারিবারিক পূজা উদ্যোক্তারা এখন সর্বশেষ নান্দনিক আয়োজনের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। শারদ উৎসব উপলক্ষে সিলেট নগরের বিপণীবিতানগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। সনাতন ধর্মের লোকজন নতুন পোশাক কিনতে এ মার্কেট ও মার্কেট ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সর্বত্রই এক সাজ সাজ রব। পূজো আসছে ভেবে সনাতন ধর্মের লোকজন আনন্দ প্লাবনে ভাসছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বার্ষিক প্রতিনিধি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। পূজা কমিটিগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বছর সিলেট মহানগর এলাকায় সার্বজনীন ১৪৬টি ও পারিবারিক আয়োজনে ১৬টি পূজো অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বমোট ১৬২টি মণ্ডপে পূজো অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সার্বজনীন পূজো হবে ৪৭৪টি এবং পারিবারিক পূজো হবে ২৬টি। সিলেট জেলার সার্বজনীন ও পারিবারিক মিলিয়ে সর্বমোট ৪৭৪টি পূজো হবে। সিলেট জেলা এবং সিলেট মহানগর মিলিয়ে সর্বমোট ৬৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত হবে।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৫৮টি ও পারিবারিক ৫টি, বালাগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৩০টি ও পারিবারিক ৩টি, কানাইঘাট উপজেলায় সার্বজনীন ৩৫টি, জৈন্তাপুর উপজেলায় সার্বজনীন ২০টি, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৪০টি ও পারিবারিক ১টি, বিশ্বনাথ উপজেলায় সার্বজনীন ২৩টি ও পারিবারিক ৩টি, গোয়াইনঘাট উপজেলায় সার্বজনীন ৪০টি, জকিগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৯৩টি ও পারিবারিক ২টি, বিয়ানীবাজার উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৪২টি ও পারিবারিক ১২টি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ২৮টি এবং ওসমানীনগর উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৩৯টি। সিলেট মহানগরের কোতোয়ালী মডেল থানা এলাকায় সার্বজনীন পূজো হবে ৩১টি ও পারিবারিক ১১টি, জালালাবাদ থানায় সার্বজনীন ১৯টি ও পারিবারিক ২টি, এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় সার্বজনীন ৩৯টি ও পারিবারিক ১টি, শাহপরাণ (র.) থানা এলাকায় সার্বজনীন ২৫টি ও পারিবারিক ১টি, দক্ষিণ সুরমায় সার্বজনীন ১৫টি ও এবং মোগলাবাজারে সার্বজনীন ১৭টি ও পারিবারিক ১টি পূজো অনুষ্ঠিত হবে।
সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষে শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজো আয়োজনের মূল ৫টি দিন যথাক্রমে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সিলেট নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। তার পাশাপাশি নগরের মণ্ডপগুলোকে বর্ণিল সাজে সাজানোর ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায়। প্রতি বছর এই পূজাতে সিলেট নগরে নতুন নতুন সাজসজ্জা চোখে পড়ে।
সম্প্রীতির নগর সিলেটে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই পূজাতে সকল ধর্মের মানুষকেই আনন্দ ভাগ করে নিতে দেখা যায়।
আগামী ১০ অক্টোবর শনিবার পবিত্র মহালয়া অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট নগরের মিরাবাজারস্থ শ্রীশ্রী বলরাম জিউর আখড়ায় ৩ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে মহালয়া উদ্যাপন পরিষদ, শ্রীহট্ট। ৮ অক্টোবর থেকে মহালয়ার অনুষ্ঠান শুরু হবে।
এই বছর দু’দিন মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠী। পরদিন ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী। ১৮ অক্টোবর রবিবারও মহাসপ্তমীর তিথি। ১৯ অক্টোবর সোমবার মহাঅষ্টমী। ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার শুভ বিজয়া দশমী।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়ন বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা এই বছর আনন্দমুখরভাবেই উদ্যাপিত হবে। শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসব আনন্দে যাতে ভাটা না পড়ে সেজন্য আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি। সকল পূজামণ্ডপকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্বক সহযোগিতাও করা হচ্ছে।’ ‘এছাড়া পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ও চার্জার লাইট প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।’
দুর্গাপূজার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার দাস বলেন, ‘সিলেট জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে পূজা আয়োজনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা, প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা, সার্বক্ষণিক জেনারেটর রাখা এবং সরকারি সকল নির্দেশনা মেনে চলার জন্য আমরা সকল পূজোর আয়োজকদের সবিনয় অনুরোধ করেছি। আশা রাখছি, এবারও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শারদ উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপিত হবে।’
এবার দেবী দুর্গা মাতার আগমন ঘটবে ঘোটকে ও গমন হবে নৌকায়। এদিকে, আগামী ২৫ অক্টোবর রবিবার শ্রীশ্রী কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ও ৮ নভেম্বর রবিবার শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
Editor: Shahin Ahmed & Sadrul Islam Lukman
Office: Hoque Super Market, 3rd Floor, Zindabazar, sylhet.
Email: ekusheynet.syl@gmail.com
Contact: 01739447302