
নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিষ্ক্রিয়তা দূর করতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড। সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা রোধ এবং দলীয় আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ধারাবাহিকভাবে একাধিক দায়িত্বশীল নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার ও অব্যাহতি প্রদান করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, অতি সম্প্রতি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ১ নম্বর মোল্লারগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম-সম্পাদক তৌহিদ খানকে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। এর আগে কেন্দ্রের নির্দেশে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ওয়েছ আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খছরুজ্জামান পারভেজ, কোষাধ্যক্ষ আবুল বাশার এবং জকিগঞ্জ উপজেলার সাধারণ সম্পাদকসহ সিলেটের মোট ৯ জন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে দলীয় নির্দেশ অমান্য করায় বহিষ্কার করা হয়েছিল।
একই ধারাবাহিকতায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কোহিনুর আহমদ এবং জেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেমকেও সংগঠনবিরোধী কাজের অভিযোগে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়াও নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুহেল আহমদসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকে সাম্প্রতিক সময়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এদিকে, এই ব্যাপক সাংগঠনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গতমঙ্গলবার (৩১ মার্চ ২০২৬) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক জরুরি সিদ্ধান্তে সিলেট বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রচার সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন তুহিনকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ইতোমধ্যে এই কঠোর বহিষ্কারাদেশ অনুমোদন করেছেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, একাধিক রাজনৈতিক ও ফৌজদারি মামলায় জড়িত থাকার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে দলীয় সকল প্রকার কার্যক্রমে অনুপস্থিত থাকা এবং সংগঠনের সাথে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না রাখার অপরাধে মোঃ আনোয়ার হোসেন তুহিনকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল স্তরের পদ থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়, বহিষ্কৃত নেতার কোনো ধরনের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা আইনি অপকর্মের দায়-দায়িত্ব দল বহন করবে না। একই সাথে সংগঠনের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের বহিষ্কৃত তুহিনের সাথে কোনো ধরনের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের সাবেক এই দায়িত্বশীল নেতার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেটের কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি গুরুতর রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়। যার সি.আর. মামলা নম্বর: ২৪৫/২০২৩ এবং থানা মামলা নম্বর: ১১৫/২০২৩। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা), ৩২৩ ও ১৪৭ ধারায় রুজু করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে আদালতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন, যার চার্জশিট নম্বর: ২৫৩ (তারিখ: ২৪ জুলাই ২০২৪)।
পুলিশ চার্জশিট দাখিল করার পর বিজ্ঞ আদালত আসামি মোঃ আনোয়ার হোসেন তুহিন-এর বিরুদ্ধে অ-জামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারধীন অবস্থায় রয়েছে এবং আসামি দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্র থেকে বহিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এবং আদালতে মামলা সচল থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে গ্রেফতারের জন্য তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। তুহিনকে গ্রেফতার করতে পুলিশ ইতিমধ্যে তার সিলেটস্থ বাসভবনসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। বিএনপি ও ছাত্রদলের এই গণ-বহিষ্কারের ঘটনা এবং চলমান পুলিশি অভিযানে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।