• ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কানাডা প্রবাসী গৌসুল আলম ও তার পরিবারের উপর নির্যাতন বন্ধের দাবী আসকের

admin
প্রকাশিত জুন ২৪, ২০২৬
কানাডা প্রবাসী গৌসুল আলম ও তার পরিবারের উপর নির্যাতন বন্ধের দাবী আসকের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কানাডা প্রবাসী গৌসুল আলম ও তাঁর পরিবারের ওপর ধারাবাহিক বর্বরোচিত নির্যাতন এবং সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক)। একই সাথে তার পরিবারের উপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।

আজ বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) এর চেয়ারম্যান রকিব আল মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের কারণে জাতীয় পার্টির সিলেট জেলা শাখার বিমানবন্দর থানার অন্তর্গত সাহেবের বাজার এলাকার কুনিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও রাজনৈতিক কর্মী গৌসুল আলমের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করেছে মানবাধিকার তদন্ত কেন্দ্র সেল।

ভুক্তভোগী ও গৌসুল আলমের স্ত্রী তানিয়া বেগমের মানবাধিকার সেলে দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের তথ্য, স্থানীয় থানা পুলিশের নথি এবং চাক্ষুষ সাক্ষীদের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে ঘটনার একটি ধারাবাহিক সত্যনিষ্ঠ বিবরণ ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রকাশ করে।

প্রকাশিত অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, গৌসুল আলম সিলেট জেলায় জাতীয় পার্টির একজন সক্রিয় ও একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর ক্রমাগত চাপ ও হুমকি সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের মে মাসে তাঁর ওপর একটি পরিকল্পিত ও প্রাণঘাতী শারীরিক হামলা চালানো হয়, যার ফলে তিনি গুরুতর জখম হয়ে দীর্ঘসময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

রাজনৈতিক শত্রুতার চরম পর্যায়ে, প্রতিপক্ষ দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তথা ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ ছত্রী, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিক এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নাঈম আহমেদের সরাসরি মদদ ও নির্দেশনায় গৌসুল আলমকে সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা তাঁর চোখ ও হাত বেঁধে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখে এবং তাঁর পরিবারের কাছে ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। নিরুপায় পরিবার তাঁর জীবন বাঁচাতে উক্ত মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করার পর, সন্ত্রাসীরা তাঁকে হাত-পা বাঁধা ও অচেতন অবস্থায় একটি মাঠে ফেলে যায়।

উক্ত বর্বরোচিত অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ক্রমাগত পুলিশি হয়রানি, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং চরম ঝুঁকির মুখে থাকায় গৌসুল আলম একপর্যায়ে নিজের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর অনুপস্থিতিতে সিলেটের বাড়িতে তাঁর পরিবারের ওপর অব্যাহত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু হলে, তাঁর স্ত্রী তানিয়া বেগম সন্তানদের নিয়ে পৈতৃক ভিটা সিলেট ছেড়ে প্রাণভয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাযাবরের মতো পালিয়ে বেড়াতে শুরু করেন।

গৌসুল আলমের পরিবার সিলেট ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও গত ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি দল যৌথভাবে সিলেটের কুনিপাড়ার বাড়িতে হানা দেয়। তারা বাড়িতে গৌসুল আলম বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের না পেয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে এবং আত্মীয়-স্বজনদের চরম হুমকি ও মানসিক নির্যাতন প্রদান করে, যা স্থানীয় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটানো অবস্থায় গৌসুল আলমের ছেলে জারির ইবনে আলম নাবিল (২০), তার পড়াশোনার কথা চিন্তা করে পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা থেকে একা সিলেটে আসে।

পরীক্ষা শেষ করে সে যখন পুনরায় একা কুমিল্লায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন পথিমধ্যে বিবাদী কয়েছ লোদী (সভাপতি, বিমানবন্দর থানা বিএনপি), তারা মিয়া (সভাপতি, ৩নং খাদিম নগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ), আব্দুল মালিক এবং সোহাগ ছত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে ১০/১২ জনের একটি সন্ত্রাসী দল পরিকল্পিতভাবে নাবিলের গতিরোধ করে।

তারা নাবিলকে দেখামাত্রই চড়াও হয় এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। তাদের নিষ্ঠুর আঘাতে নাবিলের ডান হাতের কব্জির হাড়ে অত্যন্ত মারাত্মক ইনজুরি হয় এবং ডান হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে তারা নাবিলকে পরবর্তীতে দেখামাত্রই খুন করার হুমকি দিয়ে চলে যায়।

গুরুতর আহত অবস্থায় নাবিলকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসা করানো হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শে সে টানা ১১ দিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করে। এই বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ঘটনার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ইং তারিখে ভুক্তভোগীর মা তানিয়া বেগম সিলেটের বিমানবন্দর থানায় কয়েছ লোদী, তারা মিয়াসহ নামধারী আসামিদের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে যান। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযুক্তরা স্থানীয়ভাবে চরম প্রভাবশালী হওয়ায় এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে বিমানবন্দর থানা পুলিশ উক্ত গুরুতর অভিযোগটি গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায় এবং কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি রুজু করেনি।

এদিকে সিলেট ছাড়ার পর তানিয়া বেগম ও তাঁর সন্তানদের নিয়ে কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানাধীন বল্লবপাড়া (গুনাইঘর) গ্রামের বাসিন্দা সালাম মিয়ার বাড়িতে ভাড়াতিয়া হিসেবে বসবাস শুরু করেন। তানিয়া বেগমের সন্ধান পেয়ে গত চলতি বছরের ৯ মে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতকারী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বল্লবপাড়া গ্রামের সেই ভাড়া বাড়িটি ঘেরাও করে। শত্রুপক্ষের অতর্কিত আগমন টের পেয়ে তানিয়া বেগম এবং তাঁর সন্তানরা জীবন বাঁচাতে পেছনের দরজা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে বাসায় কাউকে না পেয়ে হিংস্র দুষ্কৃতকারীরা ঘরের দরজা-জানলা ভাঙচুর করে এবং বাড়ির মালিক সালাম মিয়ার ওপর চড়াও হয়ে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে বাড়ির মালিক সালাম মিয়া দেবিদ্বার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তানিয়া বেগম ও তাঁর পরিবারকে অবিলম্বে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন, যার ফলে পরিবারটি আবারও গৃহহীন হয়ে পড়ে।

এদিকে মানবাধিকার সেলের নিবিড় অনুসন্ধান ও সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো:

দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা: মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে গৌসুল আলম এবং তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের নূন্যতম জীবন ও জানমালের নিরাপত্তা নেই। সিলেট থেকে শুরু করে কুমিল্লা পর্যন্ত দেশের কোনো প্রান্তেই এই পরিবারটি নিরাপদ নয়। স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও পুলিশের পক্ষ থেকে আইনি সহযোগিতা না পাওয়া এবং উল্টো আসামিদের পক্ষাবলম্বন করার কারণে পরিবারটি চরম বিচারহীনতা ও মারাত্মক জীবনঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিদেশে অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি: ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে গৌসুল আলম বর্তমানে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করছেন। দেশের বাইরে থাকায় তিনি এই মুহূর্তে সাময়িকভাবে কিছুটা নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন এবং নিজের জীবন রক্ষা করতে পেরেছেন।

দেশে ফেরার চরম ঝুঁকি ও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা: তাদের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ বলছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে গৌসুল আলম যদি কোনো কারণে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তবে তাঁর ওপর পুনরায় প্রাণঘাতী হামলা হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রভাবশালী অপরাধী চক্র যেভাবে তাঁর পরিবারের পেছনে লেগে রয়েছে, তাতে তিনি দেশে ফিরলে তাঁর জীবননাশের চরম ঝুঁকি রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে তাঁর ওপর আরও বড় ধরনের বর্বরোচিত বা অপূরণীয় ক্ষতি নেমে আসতে পারে।

মানবাধিকার তদন্ত সেলের সুনির্দিষ্ট দাবি ও আহ্বান:

১. সিলেট বিমানবন্দর থানায় অবিলম্বে মামলা গ্রহণ: রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সিলেট বিমানবন্দর থানাকে অনতিবিলম্বে তানিয়া বেগমের লিখিত অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং কয়েছ লোদী, তারা মিয়া, আব্দুল মালিক ও সোহাগ ছত্রীসহ হামলার সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

২. ভুক্তভোগী পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বারবার হিংস্র হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া গৌসুল আলমের ছেলে জারির ইবনে আলম নাবিল এবং তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে অবিলম্বে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।

৩. উচ্ছেদ ও হয়রানি বন্ধ: রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে গৌসুল আলম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে সিলেট ও দেশের অন্যান্য স্থানে চলমান অন্যায্য উচ্ছেদ, অপহরণের অপচেষ্টা ও ধারাবাহিক হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।