
একুশে নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সিলেট জেলার দ্বাদশ সম্মেলনের উদ্বোধনকালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য কমরেড ডা. দিবালোক সিংহ বলেন, দেশ আজ ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ‘৭১ সালে এদেশের মানুষ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জীবন পণ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। চেয়েছিল ভোট ও ভাতের অধিকার এবং বাক স্বাধীনতা রক্ষা করতে। শােষণ-বঞ্চনা নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ তথা বৈষম্যহীন সমতার সমাজ গঠন করতে। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের কাঙ্খিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হযনি। এমন অবস্থায় শ্রমিক কৃষকসহ মেহনতি মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
শুক্রবার (১৪ই জানুয়ারি) বিকেল ৩টায় সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে ‘দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও, বিকল্প গড়ো’ ¯েøাগানে অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন জাতীয় সঙ্গীতের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা ও পার্টির পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের। উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি কমরেড ডা. দিবালোক সিংহ। এসময় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল পরিবেশন করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গােষ্ঠি সিলেট জেলার শিল্পীরা।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা পর্ব। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির সংগ্রামী সভাপতি কমরেড হাবিবুল ইসলাম খোকার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আনোয়ার হোসেন সুমন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদের আহবায়ক কমরেড খায়রুল হাসান।
প্রধান অতিথি কমরেড দিবালোক সিংহ ছাড়াও আলোচনায় অন্যানের অংশগ্রহণ করন। সিপিবি সিলেট জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি কমরেড বেদানন্দ ভট্রাচার্য্য, সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি কমরেড মকবুল হোসেন, সিপিবি দ্বাদশ সিলেট জেলা সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদের চেয়ারম্যান কমরেড সাথী রহমান, সিপিবি সুনামগঞ্জ জেলার কমিটির সাধারণ সম্পাদক জালাল সুমন, সিপিবি বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কমরেড আনিসুর রহমান, উদ্দীচী সিলেট জেলা সংসদের সভাপতি এনায়েত হাসান মানিবা, খেলাঘর সিলেট জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিধান দেব চয়ন, প্রগতি লেখা সংঘ সিলেট জেলার সহ-সভাপতি মাধব রায়, যুব ইউনিয়ন সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক নিরঞ্জন দাস খোকন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক নাহিদ হাসান প্রান্তিক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সিলেট জেলা সংসদের আহবায়ক মনীষা ওয়াহিদ, তরুণ ছাত্রনেতা হাসান বক্ত চৌধুরী কাওছার প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কমরেড দিবালোক সিংহ আরও বলেন, দেশ দুই ভাগে ভাগ হয়ে রয়েছে। একদিকে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ যারা আজ চরম বৈষম্যের শিকার, যারা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ। তারা শোষিত বঞ্চিত নির্যাতিত। অন্যদিকে শকরা ১ ভাগ মানুষ যারা ধনিক শ্রেণি। এই ১ভাগ মানুষ হচ্ছে লুটপাটকারী দুর্নীতিবাজ। তাদের ঘরে সম্পদের পাহাড়। এই দুর্নীতিবাজ ধনিক শ্রেণির মানুষেরা সাধারণ মানুষের সম্পদ অবাধে লুটপাট করে বিদেশেও পাচার করছে, বেগম পাড়া গড়ে তুলছে। বর্তমান করোনাকালীন দুঃসময়েও তাদের লুটপাট প্রক্রিয়া ক্রমাগত বেড়েই চলেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায়।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের আপােষকামিতায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। আর ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের লেবাসে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ পরিচালনা করছে। মুখে গণতন্ত্রের কথা আর মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছে, কিন্তু কোনােভাবেই বিরুদ্ধমতকে সহ্য করতে পারছে না। নানা কায়দায় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এমনকি মানুষের স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারকেও রুদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলসমূহের কার্যক্রমও নানা বাঁধা ও বিপত্তির সম্মুখীন। যার ফলে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তিগুলোও এ দেশকে ঘিরে তাদের চক্রান্তের জাল অবিরত বিস্তার করে চলছে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন উর্ধগতিতে শ্রমিক কৃষকসহ মেহনতি জনসাধারণ আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ভাঙ্গাচোরা এ সমাজটাকে পাল্টাতে হবে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। এছাড়া মেহনতি সাধারণ মানুষের মুক্তির আর কোনো উপায় নেই।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, দেশ আজ লুটেরা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দূর্বার আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের লড়াই জোরদার এর মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক শাসন-শোষণের অবসান ঘটাতে হবে। নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে নতুন সমাজ গড়ার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য জনগণের প্রতি বক্তারা আহবান জানান।
অন্যানের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গণতন্ত্রী পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী, বাম গণতান্ত্রিক জোট সিলেট জেলা সমন্বয়ক ও বালাদেশের ওর্য়ার্কাস পার্টি (মার্কসবাদী) সিলেট জেলার সমন্বয়ক কমরেড সিরাজ আহমদ, সাম্যবাদী দলের জেলার সভাপতি কমরেড ধীরেন সিংহ, বাসদ সিলেট জেলা সমন্বয়ক কমরেড আবু জাফর, ওয়ার্কার্স পার্টি সিলেট জেলার সভাপতি সিকন্দও আলী, ন্যাপ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন, জাসদ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কে. এ কিবরিয়া, বাসদ (মার্কসবাদী) জেলা নেতা হুমায়ুন রশিদ শোয়েব, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের জেলা নেতা এডভোকেট রনেন সরকার রনি, অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আল আজাদ প্রমুখ।
সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। এতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গােষ্ঠী সিলেট জেলা সংসদ ও নৃত্যশৈলী সিলেট মনােজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে।
এছাড়াও সম্মেলন উপলক্ষে “দ্রোহী সংশপ্তক” নামে একটি নান্দনিক স্মারক সংকলনও প্রকাশ করা হ্য।