
স্টাফ রিপোর্টার : সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যবসায়ী ধর্মীয় চর্চা ও জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহিনুর পাশা চৌধুরী এবং তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে হুমকি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। ভুক্তভোগী কৃপেন্দ্র দাস (৪০) দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে জমি হস্তান্তরের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং ধর্মীয় কার্যক্রমেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এসব ঘটনার পরও স্থানীয়ভাবে কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সিলেট নগরের জিন্দাবাজার এলাকার শুকরিয়া মার্কেটে “জগন্নাথ বস্ত্রালয়” নামে কাপড়ের ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং স্থানীয় হিন্দু ধর্মীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার কারণে একটি ইসলামী গোষ্ঠীর সদস্যরা তার ওপর অসন্তুষ্ট হন। একাধিকবার তাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সীমিত বা বন্ধ করার জন্য মৌখিকভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ২০২২ সালের মার্চ মাসে ‘দোল পূর্ণিমা’ উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালে নিকটবর্তী একটি মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তাকে ও তার বাবাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ গ্রহণ করেনি বলেও তিনি দাবি করেন।
ভুক্তভোগী আরও অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের জুলাই মাসে ‘রথযাত্রা’ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা চলাকালে নিজেদের হেফাজতে ইসলামের অনুসারী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, তারা শোভাযাত্রার সরঞ্জাম ভাঙচুর করে এবং অংশগ্রহণকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে সহায়তা চাইলে পরিস্থিতি বিবেচনার কথা বলে অনুষ্ঠান স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
কৃপেন্দ্র দাসের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে নিয়ে হেফাজত নেতা শাহিনুর পাশা চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করান। সেখানে তার জমি মাদ্রাসা সম্প্রসারণের জন্য হস্তান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি এতে রাজি না হলে তাকে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন। পরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং থানায় অভিযোগ করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ হয়নি বলে জানান।
ভুক্তভোগী আরও বলেন, পরবর্তীতে তাকে বিভিন্ন সময় ফোনে ও সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। জমি হস্তান্তর না করলে তার ও তার পরিবারের ক্ষতি করা হবে বলেও ভয় দেখানো হয়। তিনি বলেন, “আমি সংখ্যালঘু হওয়ায় কোথাও গিয়ে সঠিক সহায়তা পাচ্ছি না। থানায় গেলেও অভিযোগ নিতে চায় না। স্থানীয়ভাবে সবাই ভয় পায়।”
জুন ২০২৩ মাসে স্ত্রীসহ মন্দির থেকে ফেরার পথে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের রিকশা থামিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং জমি হস্তান্তরের জন্য চাপ দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তার স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
ভুক্তভোগী জানান, এসব ঘটনার পর তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছেও সহায়তা চান, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পাননি। এতে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে হেফাজত নেতা শাহিনুর পাশা চৌধুরী বা তার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের মতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহায়ক হবে।