
নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী আসফাতুল জান্নাত রিমিকে অপহরণ করে শারীরিক ও যোন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। একই সঙ্গে মূল ঘটনাকে আড়াল করা এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে তাকে একটি সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসফাতুল জান্নাত রিমি সিলেট অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে পরিবার জানিয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে জিন্দাবাজারে কেনাকাটা শেষে বাসায় ফেরার পথে রিমিকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুবেল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে পরিবার। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে রিমিকে অপহরণ করা হয় এবং পরে তার ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের একপর্যায়ে রিমি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরিবারের দাবি, হাসপাতালে নেওয়ার পর রিমির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ওসিসি বিভাগে স্থানান্তর করে চিকিৎসা দেন। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি ঘটনার পর তৈরি হওয়া মানসিক বিপর্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পরপরই বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয় বলে পরিবার জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর রিমির চাচা মো. কয়েছ মিয়া মোগলাবাজার থানায় জিডি নং-৫০ দায়ের করেন। পরিবারের দাবি, ওই জিডির মাধ্যমে রিমিকে অপহরণ ও পরবর্তী পরিস্থিতির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছিল।
তবে পরিবারের অভিযোগ, অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পরিবর্তে পরবর্তীতে বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধের দিকে গড়ায়। তাদের দাবি, রিমি ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী হওয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাকে এবং তার পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মূল ঘটনা আড়াল করা এবং রিমিকে আইনি হয়রানির মধ্যে ফেলতে দক্ষিণ সুরমা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুবেল ইসলাম বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মোগলাবাজার থানায় রিমির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। পরিবারের দাবি, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এতে রিমিকে মিথ্যাভাবে জড়ানো হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিমি ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে চলে যান। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেননি বলে পরিবার জানিয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ মে পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালালে পরিবারের সদস্যরা মামলার বিষয়টি জানতে পারেন বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, রিমির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সময় তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। তাদের অভিযোগ, বিদেশে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে গোপনে মামলাটি করা হয় এবং পরে পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে বিষয়টি পরিবারের কাছে প্রকাশ পায়।
রিমির পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি পরবর্তীতে মামলায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তার দেশে ফিরে আসা নিয়েও পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দেশে ফিরলে রিমি পুনরায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা হয়রানির শিকার হতে পারেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে অপহরণ, নির্যাতন এবং পরবর্তী মামলার পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রিমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও আদালতের আইনগত প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। রুবেল ইসলাম বা তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।